সি.এস (C.S) জরিপ ও খতিয়ান: ভূমি ব্যবস্থাপনার ইতিহাসের এক নির্ভরযোগ্য অধ্যায়
বাংলাদেশে ভূমি মালিকানা ও জমি সংক্রান্ত তথ্য যাচাই করতে গিয়ে প্রায়ই দেখা যায় বিভ্রান্তি, ভুল তথ্য ও দলিলের জটিলতা। এসব সমস্যার মূলে রয়েছে একটি সুসংগঠিত, নির্ভরযোগ্য ভূমি রেকর্ড না থাকা কিংবা সঠিকভাবে তা চিনে না উঠতে পারা। অথচ ব্রিটিশ আমলে পরিচালিত একটি জরিপ—সি.এস জরিপ/ সি.এস খতিয়ান(Cadastral Survey)—আজও ভূমি সংক্রান্ত যে কোনো মামলায়, মালিকানা নির্ধারণে কিংবা রেকর্ড যাচাইয়ে সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য দলিল হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
সি.এস খতিয়ান/জরিপ কেবল একটি খতিয়ান/জরিপ নয়, এটি ছিল উপমহাদেশের ইতিহাসে ভূমি ব্যবস্থাপনাকে বৈজ্ঞানিক ভিত্তিতে রূপান্তরের সূচনা।
সি.এস (C.S) জরিপ কী? সি.এস জরিপের ইতিহাস:
সি.এস-এর পূর্ণরূপ হলো Cadastral Survey। এটি উপমহাদেশের প্রথম একটি বিশদ ও সুনির্দিষ্ট ভূমি জরিপ, যেটিকে এখনো সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য জরিপ হিসেবে গণ্য করা হয়। এই জরিপটি শুরু হয় ১৮৮৫ সালের বঙ্গীয় প্রজাস্বত্ব আইনের ১০ নম্বর ধারা অনুযায়ী।
এই জরিপ সারা দেশে পরিচালিত হলেও সিলেট ও পার্বত্য অঞ্চল এর আওতার বাইরে ছিল।
সি.এস জরিপের সূচনা হয় ১৮৮৮ সালে কক্সবাজার জেলার রামু থানায়, যা শেষ হয় ১৮৮৯ সালে। এরপর চট্টগ্রাম জেলায় ১৮৯০ থেকে ১৮৯৮ সাল পর্যন্ত এটি পরিচালিত হয়। পর্যায়ক্রমে দেশের বিভিন্ন জেলায় সিএস জরিপ পরিচালিত হতে থাকে এবং শেষ পর্যন্ত ১৯৪০ সালে দিনাজপুরে গিয়ে এর কার্যক্রম শেষ হয়।
যেহেতু এই জরিপ প্রতিটি জেলায় আলাদাভাবে পরিচালিত হয়েছিল, অনেক সময় একে “জেলা জরিপ (District Survey – D.S)” নামেও ডাকা হয়। বিশেষ করে বৃহত্তর ফরিদপুর ও বরিশাল অঞ্চলেও এই জরিপ পরিচালিত হয়েছিল।
পরবর্তীতে সিলেট অঞ্চলে সিএস জরিপের পরিবর্তে এস.এ (State Acquisition) জরিপ করা হয়, যা ১৯৬৩ সালে এসে শেষ হয়।
সি.এস (C.S.) খতিয়ান চেনার ৯টি কার্যকর উপায়:
সি.এস খতিয়ানকে চেনার জন্য কিছু নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্য রয়েছে, যেগুলো এই খতিয়ানকে অন্য যেকোনো খতিয়ানের চেয়ে স্বতন্ত্র ও নির্ভরযোগ্য করে তোলে। নিচে এই বৈশিষ্ট্যগুলো তুলে ধরা হলো—
১. লম্বালম্বি বিন্যাস (Legal Page Format)
সি.এস খতিয়ান সাধারণত লম্বালম্বি (উলম্ব) বা ‘লিগ্যাল সাইজ পেপারে’ মুদ্রিত হয়ে থাকে।
২. উভয় পৃষ্ঠায় লেখা থাকে
খতিয়ানটি উল্টালে দেখা যায়—এপিট ও ওপিট উভয় পাশেই লেখা থাকে, যা এটি চেনার গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য।
৩. জমিদার ও প্রজার ভাগ
প্রথম পৃষ্ঠায় ‘জমিদার’ ও ‘প্রজা’ নামক দুইটি ভাগ থাকে। দ্বিতীয় পাতায় দাগ নম্বর কলামের পর “উত্তর সীমানার দাগের দখলদার” নামে একটি নির্দিষ্ট কলাম পাওয়া যায়।
৪. ‘পরগনা’ কলাম
প্রথম পৃষ্ঠার উপরের দিকে ‘পরগনা’ নামে একটি কলাম থাকে, যেখানে সংশ্লিষ্ট পরগনার নাম উল্লেখ থাকে।
৫. পুরাতন জেলা উল্লেখ
সি.এস জরিপের সময় বাংলাদেশে মাত্র ১৮টি জেলা ছিল। এই খতিয়ানের উপরের অংশে ওই ১৮ জেলার যেকোনো একটি জেলার নাম পাওয়া গেলে বুঝতে হবে এটি একটি সিএস খতিয়ান।
৬. বিধিমালার ধারা
খতিয়ানের নিচে বা উপরের কোণে দেখা যায়—১০৫, ১০৬, ১০৮, ১০৮(ক), ১০৯ বা ১১৫(খ) ধারার উল্লেখ। এই ধারা থাকলে এটি সিএস খতিয়ান হওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ।
৭. উত্তর সীমানার দখল তথ্য
দ্বিতীয় পাতায় খতিয়ানের নিজস্ব দাগ নম্বরের পাশে উত্তর সীমানায় কার জমি আছে, তা আলাদাভাবে দাগ নম্বর দিয়ে উল্লেখ থাকে।
৮. বড় হরফে “সি.এস খতিয়ান” লেখা
বর্তমানে অনেক জাবেদা নকল বা সার্টিফায়েড কপির উপরের অংশে বাংলায় বড় করে “সি.এস খতিয়ান” লেখা দেখা যায়। এটি একটি পরিষ্কার ও দৃশ্যমান পরিচয়চিহ্ন।
৯. দু’টি পৃষ্ঠার কাঠামো
সি.এস খতিয়ানে সবসময় দুটি পৃষ্ঠা থাকে—প্রথম পাতায় সাধারণ তথ্য এবং দ্বিতীয় পাতায় দখল সংক্রান্ত বিস্তারিত বিবরণ উল্লেখ থাকে।
উপসংহার
সি.এস জরিপ ও খতিয়ান আমাদের দেশের ভূমি ব্যবস্থাপনার ইতিহাসের এক মাইলফলক। এটি শুধু ভূমির দখল বা মালিকানা চিহ্নিত করতে সহায়তা করেনি, বরং ভবিষ্যতে ভূমি সংক্রান্ত যে কোনো বিরোধ নিষ্পত্তিতেও এই জরিপের তথ্য সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য দলিল হিসেবে গণ্য হয়ে আসছে।
